জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘কান্তেই’তে স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১১টায় এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় ছাড়াও আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন দুই নেতা।
বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ ক্ষেত্রে জাপানের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অবকাঠামো, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান।
এশিয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে ‘পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় জাপানের সাম্প্রতিক ৫০ বিলিয়ন ইয়েনের জরুরি সহায়তা ঋণের বিষয়টিও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। এ উদ্যোগের মাধ্যমে জাপানের কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বাংলাদেশের তরুণ উদ্যোক্তা এবং দক্ষ প্রযুক্তিবিদদের সংযোগ স্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
প্রস্তাবিত টেক পার্কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনের মতো খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা তুলে ধরা হয়।
দেশের ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরকে যুক্ত করে দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক এবং দেশব্যাপী উড়াল সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এসব বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রণয়ন, কারিগরি সহায়তা, বিনিয়োগ ও অর্থায়নে জাপানের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
এ ছাড়া জাপানের অবকাঠামো উন্নয়ন ও আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি, অবকাঠামো ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে ১ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা প্রায় ৬.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দ্রুত বাংলাদেশে জাপানি প্রতিনিধিদল পাঠানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
বাংলাদেশে জাপানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে তাঁর সরকার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, করনীতি, শুল্ক ছাড়করণ ও অর্থ স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং দক্ষতা বাড়াতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) দ্রুত কার্যকর করার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি। এ চুক্তির সুফল দুই দেশের জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে উভয় পক্ষকে একযোগে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি, স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক আইন এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হয়। এ সময় মিয়ানমারের পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য জাপানের সহযোগিতার প্রশংসা করে তিনি রাখাইনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় জাপানের সক্রিয় ভূমিকা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বৈঠকের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আশা প্রকাশ করেন, পারস্পরিক আস্থা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও অভিন্ন সমৃদ্ধির ভিত্তিতে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও গভীর ও বিস্তৃত হবে। এ সময় তিনি জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), বিডিনিউজ২৪ ডটকম ও দ্য ডেইলি স্টার।