গত রোববার (২৫ অক্টোবর) পাবনার সুজানগর উপজেলার সাতবাড়িয়া কাঞ্চনপার্ক এলাকায় প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প পরিদর্শন ও কারিগরি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। তিনি জানান, আগামী বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্পটির নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের প্রথম পর্যায় ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুন পর্যন্ত সাত বছরে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ৫০ থেকে ৫৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে। ফলে পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।
প্রকল্পের আওতায় খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, নড়াইল, বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা; ঢাকা বিভাগের রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ; রাজশাহী বিভাগের পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর জেলা রয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানির প্রবাহ বাড়ানো, কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা ও আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হলো হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি নদী ব্যবস্থার প্রবাহ পুনরুদ্ধার করা। শুষ্ক মৌসুমে এসব নদীতে পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে নদীর নাব্যতা বজায় রাখা, কৃষিকাজে পানির সংকট কমানো এবং জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এ ছাড়া গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্প, গোদাগাড়ী পাম্প হাউস এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় পানির সরবরাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর নিট চাষযোগ্য জমিতে সেচের পানির সংস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির সংকট মোকাবিলা, ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রকল্পের প্রাক্কলন অনুযায়ী, বছরে প্রায় ২৩ লাখ ৯০ হাজার টন অতিরিক্ত ধান ও ২ লাখ ৩৪ হাজার টন অতিরিক্ত মাছ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট এলাকায় লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ কমানো প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে সুন্দরবনে মিঠাপানির প্রবাহ বজায় রাখা, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং যশোরের ভবদহসহ জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় পানি নিষ্কাশনের উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় নদী খনন, নিষ্কাশন খাল পুনঃখনন এবং বাঁধ নির্মাণের মতো কার্যক্রমও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নদীর প্রবাহ ও নাব্যতা পুনরুদ্ধার এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় উন্নতি ঘটতে পারে। তবে প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে প্রকল্পের বাস্তবায়ন, পানির সুষ্ঠু বণ্টন এবং পরিবেশগত প্রভাব ব্যবস্থাপনার ওপর।
প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী, পদ্মা নদীর ওপর প্রস্তাবিত ব্যারাজটির দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার। এতে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, ১৮টি আন্ডারগেট, একটি নৌযান চলাচলের লক এবং মাছ চলাচলের জন্য দুটি ফিশ পাস নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রকল্পের প্রাক্কলনে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কৃষি ও মৎস্য খাতে উৎপাদন বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। তবে এসব সুবিধা এখনো প্রকল্পের পরিকল্পিত লক্ষ্যমাত্রা; বাস্তবায়নের পরই প্রকৃত ফলাফল মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
প্রকল্পের সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৯ লাখ ২৭ হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। কৃষি, মৎস্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ এবং সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে এসব কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পের আওতায় সাতটি স্যাটেলাইট শহর প্রতিষ্ঠা এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন গ্রামীণ জনপদ গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে নগরায়ণ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কাজ নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করা গেলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ ১৯ জেলার কৃষি, সেচ, নদী ব্যবস্থাপনা ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এত বড় প্রকল্পের সুফল নিশ্চিত করতে স্বচ্ছ ব্যয় ব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: এশিয়া পোস্ট, ২৭ অক্টোবর ২০২৬; বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) এবং বিডিনিউজ২৪ ডটকম।