প্রতিদিন দুই টন বর্জ্য পোড়ানোর সক্ষমতাসম্পন্ন এ পরীক্ষামূলক কেন্দ্রটিতে বর্জ্য দহনের সময় উৎপন্ন ধোঁয়া থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড পৃথক ও সংগ্রহের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রযুক্তিটি সফলভাবে কাজ করলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশদূষণ কমানোর প্রচেষ্টায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে বিভিন্ন দেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য দহনপ্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এ পদ্ধতিতে কঠিন বর্জ্য উচ্চ তাপমাত্রায় পোড়ানো হয়। এতে বর্জ্যের পরিমাণ কমে এবং কিছু ক্ষেত্রে উৎপন্ন তাপ থেকে বিদ্যুৎ বা অন্যান্য কাজে ব্যবহারযোগ্য শক্তি পাওয়া যায়। তবে বর্জ্যে থাকা জৈব উপাদান পোড়ানোর সময় কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ বিভিন্ন গ্যাস নির্গত হয়।
প্রচলিত দহনকেন্দ্রে সাধারণত বাতাস ব্যবহার করে আগুন জ্বালানো হয়। বাতাসের প্রায় ৭৮ শতাংশ নাইট্রোজেন এবং প্রায় ২১ শতাংশ অক্সিজেন। ফলে দহনপ্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত বাতাসের নাইট্রোজেনও ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে যায়। এতে নির্গত গ্যাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব তুলনামূলক কম থাকে।
ধোঁয়ার মধ্যে কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব কম হলে অন্য গ্যাস থেকে সেটিকে আলাদা করতে অতিরিক্ত প্রক্রিয়া ও শক্তির প্রয়োজন হতে পারে। ফলে কার্বন সংগ্রহের ব্যয় এবং প্রযুক্তিগত জটিলতা বাড়ে। বিশেষ করে বর্জ্য পোড়ানোর মতো ধারাবাহিক শিল্পপ্রক্রিয়ায় এ সীমাবদ্ধতা মোকাবিলা করা গুরুত্বপূর্ণ।
কানাডেভিয়ার উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে সাধারণ বাতাসের পরিবর্তে প্রায় বিশুদ্ধ অক্সিজেন ব্যবহার করে বর্জ্য পোড়ানো হয়। একই সঙ্গে উৎপন্ন ধোঁয়ার একটি অংশ পুনরায় চুল্লিতে পাঠানো হয়। এ প্রক্রিয়াকে ধোঁয়া বা ফ্লু গ্যাস পুনঃসঞ্চালন বলা হয়।
পদ্ধতিটির মূল উদ্দেশ্য হলো দহনপ্রক্রিয়ায় নাইট্রোজেনের উপস্থিতি কমিয়ে ধোঁয়ায় কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব বাড়ানো। সাধারণ বাতাস ব্যবহার না করায় বাতাসের বিপুল পরিমাণ নাইট্রোজেন দহনপ্রক্রিয়ায় প্রবেশ করে না। অন্যদিকে, ধোঁয়ার একটি অংশ পুনরায় ব্যবহার করায় চুল্লির ভেতরে গ্যাসের প্রবাহ ও দহনপ্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।
এর ফলে উৎপন্ন ধোঁয়ায় কার্বন ডাই-অক্সাইডের অনুপাত বাড়ে। পরে বিশেষ পৃথকীকরণ ও সংগ্রহব্যবস্থার মাধ্যমে গ্যাসটি আলাদা করা যায়। এতে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় কার্বন ডাই-অক্সাইড সংগ্রহের প্রক্রিয়া সহজ ও কার্যকর করার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রচলিত বর্জ্য দহনপ্রযুক্তিতে নির্গত ধোঁয়ায় কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব সাধারণত প্রায় ৮ থেকে ১৫ শতাংশ থাকে। নতুন পদ্ধতিতে এ ঘনত্ব ৩০ থেকে ৬০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব বাড়লে গ্যাসটি পৃথক করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ার ওপর চাপ কমতে পারে। এর ফলে সংগ্রহব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদে পরিচালন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রকৃত সুবিধা নির্ভর করবে অক্সিজেন উৎপাদন, গ্যাস পুনঃসঞ্চালন, পরিশোধন এবং কার্বন সংগ্রহে মোট কত শক্তি ব্যয় হচ্ছে, তার ওপর।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ধোঁয়ায় কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব বৃদ্ধি এবং নির্গত মোট কার্বন ডাই-অক্সাইডের ৯০ শতাংশের বেশি সংগ্রহ করা এক বিষয় নয়। প্রথমটি গ্যাসের ঘনত্বসংক্রান্ত, আর দ্বিতীয়টি সংগ্রহব্যবস্থার কার্যকারিতাসংক্রান্ত। তাই ৯০ শতাংশের বেশি সংগ্রহের লক্ষ্য বাস্তবে কতটা অর্জিত হয়, তা পরীক্ষার ফলাফলের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
টোকিওর শিনাগাওয়া এলাকায় স্থাপিত কেন্দ্রটি পরীক্ষামূলক পর্যায়ের। এর দৈনিক বর্জ্য দহনক্ষমতা দুই টন। অর্থাৎ, এটি এখনই বড় পরিসরের কোনো বাণিজ্যিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নয়; বরং নতুন প্রযুক্তির কার্যকারিতা পরীক্ষা ও প্রদর্শনের জন্য তৈরি একটি পাইলট প্ল্যান্ট।
এ ধরনের পরীক্ষামূলক কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রযুক্তির বাস্তব কার্যকারিতা, গ্যাসের ঘনত্ব, কার্বন সংগ্রহের হার, শক্তি ব্যবহারের পরিমাণ এবং পরিচালন ব্যয় সম্পর্কে তথ্য পাওয়া সম্ভব। পাশাপাশি বর্জ্যের ধরন ও আর্দ্রতার পরিবর্তনে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা কতটা বদলায়, সেটিও মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
প্রতিদিন দুই টন বর্জ্য পোড়ানোর সক্ষমতা থেকে প্রযুক্তিটি কত পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড সংগ্রহ করতে পারবে, তা সরাসরি নির্ধারণ করা যায় না। কারণ বর্জ্যের উপাদান, কার্বনের পরিমাণ, দহনপ্রক্রিয়ার দক্ষতা এবং সংগ্রহব্যবস্থার কার্যকারিতার ওপর মোট সংগ্রহের পরিমাণ নির্ভর করবে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কানাডেভিয়া প্রায় দুই বছর ধরে এ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি টোকিওর পরীক্ষামূলক দহনকেন্দ্রে ২০২৬ সালের নভেম্বর থেকে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা প্রদর্শনের পরিকল্পনা করেছে।
এ প্রদর্শনের মাধ্যমে নতুন পদ্ধতিতে বর্জ্য পোড়ানোর সময় নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড কতটা দক্ষতার সঙ্গে আলাদা করা যায়, তা মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে। পরীক্ষার ফলাফল ইতিবাচক হলে ভবিষ্যতে বৃহত্তর বর্জ্য দহনকেন্দ্রে প্রযুক্তিটি ব্যবহারের সম্ভাবনা বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে পরীক্ষামূলক প্রদর্শনের পরিকল্পনা এবং প্রযুক্তিটির বাণিজ্যিকভাবে সফল প্রমাণিত হওয়া এক নয়। এর দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা, নিরাপত্তা, শক্তি খরচ ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ফলাফল প্রয়োজন।
কার্বন ডাই-অক্সাইড একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রিনহাউস গ্যাস। বায়ুমণ্ডলে এর পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়ে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, পরিবহন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন খাত থেকে এ গ্যাস নির্গত হয়।
বর্জ্য দহনকেন্দ্র থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড সংগ্রহ করতে পারলে নির্গত গ্যাসের একটি অংশ সরাসরি বায়ুমণ্ডলে যাওয়া ঠেকানো সম্ভব হতে পারে। সংগ্রহ করা কার্বন ডাই-অক্সাইড উপযুক্তভাবে সংরক্ষণ করা হলে বা দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহারে কাজে লাগানো গেলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার প্রচেষ্টায় অবদান রাখা সম্ভব।
তবে কার্বন সংগ্রহ করলেই নির্গমন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় না। সংগৃহীত গ্যাসের পরবর্তী ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ সংরক্ষণ এবং অক্সিজেন উৎপাদন ও অন্যান্য যন্ত্র পরিচালনায় ব্যবহৃত শক্তির উৎসও বিবেচনায় নিতে হবে। বিশেষ করে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হলে প্রযুক্তিটির সামগ্রিক পরিবেশগত সুফল কমে যেতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য দহন, পুনর্ব্যবহার এবং বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এসব পদ্ধতির মাধ্যমে বর্জ্যের পরিমাণ কমানো গেলেও কার্বন নিঃসরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
জাপানের নতুন প্রযুক্তিটি সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার একটি সম্ভাব্য উপায়। এতে বর্জ্য দহন এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড সংগ্রহের প্রক্রিয়াকে একই ব্যবস্থার আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে। পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদনকারী কেন্দ্রগুলোর পরিবেশগত কার্যকারিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এ প্রযুক্তি কতটা বিস্তৃতভাবে ব্যবহার করা যাবে, তা নির্ভর করবে পরীক্ষার ফলাফল, স্থাপনা ও পরিচালনার ব্যয়, শক্তির চাহিদা এবং সংগৃহীত কার্বন ডাই-অক্সাইডের নিরাপদ ব্যবস্থাপনার ওপর।
সব মিলিয়ে, জাপানের কানাডেভিয়ার এ উদ্যোগ বর্জ্য দহনকেন্দ্র থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড সংগ্রহের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ। তবে ৯০ শতাংশের বেশি কার্বন সংগ্রহের লক্ষ্য বাস্তবে অর্জিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে পরীক্ষামূলক প্রদর্শনের ফলাফল ও বিস্তারিত কারিগরি তথ্যের অপেক্ষা করতে হবে।