চলমান বর্ষার এ পর্যায়েই দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। তার জেরে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও অতিরিক্ত রোগীর চাপ বাড়ছে। ইতিমধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের জন্য নির্ধারিত ওয়ার্ডগুলো প্রায় পূর্ণ পড়েছে। বর্তমানে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলা ও শহরে প্রতিদিনই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। আর হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসা ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ দেখা দিয়েছে। রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে বিভিন্ন জেলা শহর থেকে আসা রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। ফলে ডেঙ্গু চিকিৎসার জন্য নিজ এলাকা ছেড়ে ঢাকায় স্থানান্তরে মানুষের ভোগান্তিও বাড়ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে দেশে আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বৃষ্টির পানি জমে থাকায় দেশজুড়েই তৈরি হচ্ছে এডিস মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ। ফলে বৃষ্টি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রাজধানীসহ সারা দেশে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা। চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে যে পরিমাণ ডেঙ্গুতে যে পরিমাণ আক্রান্ত হয়েছে, জুলাইতে তার চেয়ে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। সামনের দিনগুলোতে ডেঙ্গু পরিস্থিতির আরো অবনতি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত মানুষ প্রাণ হারালেও মশক নিধনে কার্যকর উদ্যোগের অভাব, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পানিবদ্ধতার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাইরে চলে যেতে পারে বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্যানুুযায়ী, চলতি বছরের এখন পর্যন্ত ৩৯ জনের এ রোগে মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গুজ্বরের রোগী রয়েছে। তারপরেই রয়েছে বরিশাল, খুলনা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, রংপুর ও সিলেট বিভাগের অবস্থান। ইতিমধ্যে ১২ হাজারেরও বেশি রোগী ডেঙ্গুজ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
সূত্র জানায়, বর্ষার বৃষ্টিতে গত কয়েকদিনে হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের ভিড় বেড়েছে। রাজধানী ছাড়াও বাইরের জেলা শহর থেকেও ঢাকার হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগী আসছে। মূলত এলাকায় চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত না হওয়ায় রোগীদের ঢাকায় ছুটে আসছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলায় আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে এডিস মশার ঘনত্বের পরিমাণ। এখনই যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হলে আক্রান্তের সংখ্যা আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার বিস্তার রোধ করা সবচেয়ে কার্যকর উপায়। এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ে। ফলে এডিস মশার প্রজননের উপযুক্ত স্থান হচ্ছে বাসাবাড়ির ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, নির্মাণাধীন ভবনের পানি জমা স্থান, ছাদের ট্যাংক, প্লাস্টিকের পাত্র এবং বিভিন্ন ছোট-বড় জলাধার। কিন্তু এডিস মশা নিধন কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নয়। অনেক এলাকায় নিয়মিত ওষুধ ছিটানো হলেও কোথাও কোথাও দীর্ঘদিন কোনো কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না। আর শুধু ওষুধ ছিটিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বরং প্রজননস্থল ধ্বংসে সমন্বিত উদ্যোগই সবচেয়ে বেশি জরুরি।
সূত্র আরো জানায়, বর্তমানে দেশের প্রতিটি জেলা এবং উপজেলাতে এডিস মশার ঘনত্বের ইনডেক্স ২০ এর উপরে আছে। যা ডেঙ্গু ছড়ানোর জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এমন পরিস্থিতিতে সঠিকভাবে ব্যবস্থা নিতে পারলে আগস্ট এবং সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরো নাজুক রূপ নিতে পারে। কারণ অনেক জায়গায়ই মশক নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেয়ার মতো জনবল, যন্ত্র ও বাজেট নেই। বর্তমানে ঢাকার বাইরে বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, মাদারীপুর, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, ময়মনসিংহ, চাঁদপুর, কুমিল্লা, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগী বাড়তে শুরু করেছে। ওই এলাকাগুলো এডিস মশার হটস্পট হয়ে উঠেছে।
এদিকে বিশেষজ্ঞদের মতে, বৃষ্টির পানি জমে থাকার কয়েক দিনের মধ্যেই তৈরি হতে পারে এডিস মশার লার্ভা। সেক্ষেত্রে শুধু সিটি করপোরেশনের মশকনিধন কার্যক্রমের ওপর নির্ভর না করে বাসাবাড়ি, অফিস, নির্মাণাধীন ভবন ও আশপাশের জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করার উদ্যোগ জরুরি। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নগরজুড়ে পানি জমে থাকা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় বাড়ছে এডিস মশার প্রজননস্থল। তাছাড়া অনেক এলাকায় নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবেও জমে থাকা পানি দীর্ঘদিন অপসারণ হচ্ছে না।
এদিকে এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন জানান, দেশের বিভিন্ন জায়গায় এডিস মশার হটস্পট তৈরি হয়েছে। এডিস মশার বিস্তারের স্থান খুঁজে ধ্বংস করতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রতিটি জেলায় র্যাপিড রেসপন্স টিমকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। পাশাপাশি কীটতত্ত্ববিদদের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাস্থ্যকর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবকদের কাজে লাগাতে হবে। জ্বর আছে এমন রোগীদের ‘এনএস১’ টেস্ট করতে হবে। ডেঙ্গু পজিটিভ হলে আক্রান্তকে মশারির মধ্যে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে জরুরি অবস্থা বিবেচনা করে কাজ করতে হবে। আর এখনই ব্যবস্থা না নিলে ডেঙ্গু ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
অন্যদিকে এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, ডেঙ্গুজ্বর মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য হাসপাতালের ১০ শতাংশ শয্যা খালি রাখা এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যে পরীক্ষা করতে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গুর এনএস১ পরীক্ষা বিনামূল্যে করা হচ্ছে। আইজিজি ও আইজিএম পরীক্ষার ফি ৩০০ টাকা থেকে কমিয়ে ৫০ টাকা করা হয়েছে। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য অতিরিক্ত এক লাখ স্যালাইন ব্যাগও মজুত রাখা হয়েছে। আর প্রতিটি উপজেলায় পর্যাপ্ত স্যালাইন পাঠানো হয়েছে।