গাড়িটির মালিক ছিলেন শফি উদ্দিন। সামরিক অফিসার হিসাবে জিয়াউর রহমানের গতিবিধি সর্বদা পর্যবেক্ষণ করা হতো। যেকারণে দেশপ্রেমিক শফি উদ্দিন (রেলওয়ের চিফ ল্যানিং অফিসার) গোপনে চলাচলের জন্য তার গাড়িটি জিয়াউর রহমানকে দিয়েছিলেন। এই গাড়িটি হয়ে ওঠে দেশপ্রেমিক বাঙালি সেনা অফিসারদের ভ্রাম্যমান সদর দপ্তর ও গোপন বৈঠকের নির্ভরযোগ্য ঠিকানা।
আর গাড়ির ভিতরেই গড়ে উঠেছিল বিদ্রোহের নীলনকশা ,সংগঠিত হয়েছিল প্রতিরোধ ও নেওয়া হয়েছিল স্বাধীনতার পথে প্রথম দৃঢ় সিদ্ধান্ত।
১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চের ২৩ তারিখে চট্রগ্রাম সেনানিবাস থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাঙালি অফিসার ব্রিগেডিয়ার মজুমদার ও ক্যাপ্টেন আমিনকে হেলিকপ্টারে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পর বাঙালি অফিসারদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিরোধের সংকল্প তৈরি হয়। জিয়াউর রহমান তখন চট্রগাম সেনানিবাসে মেজর হিসাবে কর্মরত ছিলেন। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে ২৪ মার্চ ১৯৭১ বিকাল চারটায় মেজর জিয়াউর রহমান(পরবর্তীতে শহীদ রাষ্ট্রপতি)দু‘জন বাঙালি অফিসারকে নিয়ে সেই টয়োটা প্রাইভেট মোটর গাড়িতে করে অত্যন্ত গোপনে চট্রগ্রাম রেলওয়ের টি-২ বাংলোতে এক ঐতিহাসিক সভায় মিলিত হন। সেখানে বসে বাঙালি অফিসারদের সংগঠিত করা এবং তৎকালিন পুর্ব পাকিস্তান রেলওয়ের (চট্রগাম)চিফ ল্যানিং অফিসার শহীদ মোঃ শফি উদ্দিনের মাধ্যমে স্থানীয় অসামরিক ব্যক্তিদের সংগঠিত হতে পরামর্শ দেন। যাতে পাকিস্তানি বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে পারে।
এই মোটর কারটি কেবল সিদ্ধান্তের বাহন ছিলনা,এটি ছিল যুদ্ধ প্রস্তুতির এক নির্ভিক সহযাত্রী। মেজর জিয়াউর রহমান ও লে: কর্নেল এমআর চৌধুরী কর্তৃক চট্রগ্রাম বন্দরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জন্য আনা অস্ত্র বোঝাই জাহাজ এমভি সোয়াত থেকে অস্ত্র খালাস প্রতিরোধ ,সাধারণ জনগণের স্বতস্ফুর্ত অবরোধ সমন্বয় এবং গোপন অস্ত্র সংগ্রহ কর্মকান্ডে নীরব রণসঙ্গী এই গাড়ি।
এসব বিষয়ে জিয়াউর রহমান এর তৎপরতা জানতে পেরে পাকিস্তানি সেনারা তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র শুরু করে। এজন্য তিনিও বিদ্রোহের সুযোগ খুঁজছিলেন।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যখন ঢাকায় গণহত্যা (‘অপারেশন সার্চলাইট’) শুরু করে, তখন চট্টগ্রামে থাকা মেজর জিয়াউর রহমান তার ইউনিট নিয়ে শহর থেকে বন্দরের দিকে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে আগ্রাবাদের একটি ব্যারিকেডে মেজর খালেকুজ্জামান ক্যাপ্টেন অলি আহমেদের বার্তা নিয়ে তার সাথে দেখা করেন এবং জানান যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সেনানিবাস ও শহরে অপারেশন শুরু করেছে এবং অনেক বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছে। এই খবর শুনে মেজর জিয়া তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নেন এবং ঘোষণা দেন “We revolt” (আমরা বিদ্রোহ করলাম)। চট্রগামের ষোলশহরে একটি ড্রামের উপর দাঁড়িয়ে তিনি বিদ্রোহের ঘোষনা করেন।
এরপর তিনি ও তার বাঙালি সেনারা পাকিস্তানি অফিসারদের বন্দি করেন। জিয়া নিজে তার কমান্ডিং অফিসারের বাসায় গিয়ে তাকেও বন্দি করেন এবং পরবর্তীতে স্থানীয় টেলিফোন অপারেটরের মাধ্যমে জেলা প্রশাসক (ডিসি), এসপি, এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের জানান যে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট বিদ্রোহ করেছে এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করবে। তখন মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে অবস্থিত অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড (দ্বিতীয় প্রধান) ছিলেন।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক অভিযানের খবর পেয়ে মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম ষোলশহরে অবস্থিত অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সেনাদের একত্রিত করেন। এ সময় তিনি পাকিস্তানি অফিসারদের বন্দি করার নির্দেশ দেন। রাত ২টার দিকে প্রায় ২৫০ জন বাঙালি সেনাসদস্যকে নিয়ে তিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র লড়াইয়ে নামার শপথ নেন।
সেনাদের একটি অংশকে ষোলশহরে রেখে বাকিদের নিয়ে তিনি কালুরঘাটের দিকে অগ্রসর হন। পরবর্তীতে ২৬শে মার্চ প্রথম দফায় এবং ২৭শে মার্চ দ্বিতীয় দফায় কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন।
তার এই ঘোষণায় তিনি প্রথমে নিজেকে বাংলাদেশের অস্থায়ী বিপ্লবী সরকারের প্রধান হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন এবং দ্বিতীয় দফায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণাটি পুনরাবৃত্তি করেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়েছিল। এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক রাষ্ট্রীয় পুরস্কার।
১৯৭১ সালের ২৩ এপ্রিল পাকহানাদার বাহিনী মেজর জিয়ার ব্যবহৃত গাড়িটির মালিক শফি উদ্দিনকে তার চেম্বার থেকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। স্বাধীনতার ২৪ বছর পর শফি উদ্দিনের সহধর্মিণী বেগম রায়হানা খানম জাতির মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের মহান উদ্দেশ্যে ১৯৯৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর এই অমূল্য স্মৃতি চিহ্নটি চট্রগ্রাম সেনানিবানের ‘স্মৃতি অম্লান’জাদুঘরে হস্তান্তর করেন। তখন থেকে গাড়িটি সেখানেই দৃশ্যমান রয়েছে।।
লেখক সরকারি হাজী জামাল উদ্দিন ডিগ্রী কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিভাগের সাবেক অধ্যাপক