গত ২৬ অক্টোবর যশোর শিক্ষা বোর্ড ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষার মেধা ও সাধারণ বৃত্তির তালিকা প্রকাশ করেছে। শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর ড. মো. আব্দুল মতিন স্বাক্ষরিত তালিকায় দেখা যায়, বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখার মোট ২ হাজার ৫৮৩ জন শিক্ষার্থী মেধা ও সাধারণ বৃত্তি পেয়েছে। এর মধ্যে ৩২২ জন মেধাবৃত্তি এবং ২ হাজার ২৬১ জন সাধারণ বৃত্তি পেয়েছে।
যশোর শিক্ষা বোর্ডের প্রকাশিত বৃত্তির নিয়ম ও নীতিমালার ১৪ নম্বর ক্রমিকে বলা হয়েছে, বৃত্তি পাওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতা হবে জিপিএ ৩.০০। আবার ১৬ নম্বর ক্রমিকে বলা হয়েছে, পরিশিষ্ট ‘ক’-তে মেধাবৃত্তি (ট্যালেন্টপুল) ও সাধারণ বৃত্তির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের অনুপাত এবং বিভাগভিত্তিক সর্বনিম্ন জিপিএ (চতুর্থ বিষয় ব্যতীত) উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো শিক্ষার্থী নির্ধারিত জিপিএর চেয়ে কম পেয়েও তালিকাভুক্ত হলে অথবা নির্ধারিত জিপিএর চেয়ে বেশি পেয়েও তালিকা থেকে বাদ পড়লে, সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর বৃত্তিসংক্রান্ত সব প্রামাণ্য কাগজপত্র অনতিবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বোর্ডে দাখিল করতে হবে। এ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, পরিশিষ্ট ‘ক’ অনুযায়ী, মেধাবৃত্তির জন্য সব বিভাগে সর্বনিম্ন জিপিএ ৫.০০ নির্ধারণ করা হয়েছে। সাধারণ বৃত্তির ক্ষেত্রে বিজ্ঞান শাখায় জিপিএ ৫.০০ এবং মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় জিপিএ ৪.৮০ সর্বনিম্ন যোগ্যতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব জিপিএ চতুর্থ বিষয় বাদ দিয়ে হিসাব করার কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বেশ কিছু উপজেলায় ব্যবসায় শিক্ষা শাখার শিক্ষার্থীরা জিপিএ ৩.২৮ (চতুর্থ বিষয়সহ) পেয়েও সাধারণ বৃত্তির জন্য নির্বাচিত হয়েছে। যেমন, ব্যবসায় শিক্ষা শাখার রোল নম্বর ৪০৮৬৬৩-এর একজন শিক্ষার্থী একটি বিষয়ে ডি, দুটি বিষয়ে সি, একটি বিষয়ে বি এবং তিনটি বিষয়ে এ-মাইনাস পেয়ে চতুর্থ বিষয়সহ জিপিএ ৩.২৮ অর্জন করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, এত কম জিপিএ পেয়েও কীভাবে ওই শিক্ষার্থী বোর্ড বৃত্তি পেল? এর সহজ উত্তর হতে পারে, নির্ধারিত কোটায় বৃত্তি দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত যোগ্য শিক্ষার্থী না পাওয়ায় তুলনামূলক কম ফলাফল করা শিক্ষার্থীদেরও বৃত্তি দিতে হচ্ছে। শুধু একজন নয়, ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় এ রকম কম জিপিএ পাওয়া অনেক শিক্ষার্থী সাধারণ বৃত্তি পেয়েছে।
একই শাখার রোল নম্বর ৪০৮৬৮১-এর একজন শিক্ষার্থী বাংলায় এ-মাইনাস, ইংরেজিতে ডি, গণিতে সি এবং বিজ্ঞানে বি পেয়ে জিপিএ ৩.৭৮ অর্জন করেছে। অন্যদিকে, রোল নম্বর ৪০৮৬৪১-এর একজন শিক্ষার্থী দুটি বিষয়ে সি, দুটি বিষয়ে বি এবং তিনটি বিষয়ে এ-মাইনাস পেয়ে জিপিএ ৩.৩৯ অর্জন করেছে। তারাও সাধারণ বৃত্তির জন্য নির্বাচিত হয়েছে। এ রকম আরও অনেক শিক্ষার্থী কম জিপিএ পেয়েও বৃত্তি পেয়েছে।
অপরদিকে, অনেক শিক্ষার্থী ভালো ফলাফল করেও বোর্ড বৃত্তির জন্য নির্বাচিত হয়নি।
বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী, মেধাবৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা প্রতি মাসে ৬০০ টাকা এবং প্রতিবছর এককালীন ৯০০ টাকা পাবে। অন্যদিকে, সাধারণ বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা প্রতি মাসে ৩৭৫ টাকা এবং প্রতিবছর এককালীন ৪৫০ টাকা পাবে। ২০২৬ সালের জুলাই মাস থেকে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের কোর্স সমাপনী পর্যন্ত (৩-৪ বছর) এ বৃত্তি দেওয়া হবে। এ ছাড়া সব বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী কলেজে বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ পাবে। বোর্ড বৃত্তি শুধু কিছু আর্থিক সুযোগ-সুবিধার বিষয় নয়; এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন করা হয়।
সময় এসেছে বৃত্তির নীতিমালা সংশোধনের। সব শাখায় বৃত্তির জন্য চতুর্থ বিষয় বাদে সর্বনিম্ন জিপিএ ৪.০০ নির্ধারণ করা উচিত। পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি ও গণিত—এই তিনটি মৌলিক বিষয়ে অবশ্যই ‘এ’ গ্রেড পাওয়ার শর্ত যুক্ত করা প্রয়োজন। যতই কোটা থাকুক না কেন, কোনো শিক্ষার্থী বাংলায় ‘বি’, ইংরেজিতে ‘সি’ ও গণিতে ‘ডি’ গ্রেড পেয়েও বোর্ড বৃত্তি পেলে বৃত্তির মর্যাদা, মেধার যথাযথ মূল্যায়ন এবং সর্বোপরি শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
তাই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে, বৃত্তির তালিকায় কোনো ভুল হয়ে থাকলে তা সংশোধন করা প্রয়োজন। যোগ্য শিক্ষার্থীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে এবং অযোগ্যদের বাদ দিয়ে যশোর শিক্ষা বোর্ড একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
লেখক: কলামিস্ট ও উন্নয়নকর্মী