মাতৃভাষার প্রতি মানুষের টান সহজাত। নিজের ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করা এবং গল্প-কথায় যে স্বাচ্ছন্দ্য সেটি আর কোনো ভাষায় নেই। যার ফলে নিজের ভাষাকেই পৃথিবীর সেরা মনে হয়। কবি-সাহিত্যিকদের লেখায়ও তার প্রমাণ মেলে।
মুসলিম রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ তার ‘মাতৃভাষা’ কবিতায় বলেছেন, ‘হাজার সুরে, হাজার ভাষায় এই দুনিয়া ঘেরা, আর মাতৃভাষা বাংলা আমার সকল ভাষার সেরা।’ আর প্রাচীন কবি রামনিধি গুপ্ত বলেছেন, ‘বিনে স্বদেশী ভাষা, মিটে কি আশা?’ অন্যদিকে মাতৃভাষার প্রতি আকুলতা জানিয়ে মাইকেল মধুসূদন দত্ত তার ‘বঙ্গভাষা’ কবিতায় লিখেছেন, ‘বহু দেশ দেখিয়াছি বহু নদ-দলে, কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার জলে?’
আমরা বাংলাদেশি, আমাদের ভাষা বাংলা। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে পেতে আমাদের পাড়ি দিতে হয়েছে রক্তাক্ত পথ। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি (৮ ফাল্গুন) আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, আবদুস সালাম, রফিক উদ্দিন আহমদ, শফিউর রহমানসহ অনেকের প্রাণের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি রাষ্ট্রভাষা বাংলা। সেই দিনটিকে স্মরণ করে এবারের মহান শহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হচ্ছে আজ।
জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকোর এবারের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রতিপাদ্য ‘ইয়ুথ ভয়েসেস অন মাল্টিলিঙ্গুয়াল এডুকেশন’।
বাংলাদেশে গতকাল শুক্রবার রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে দিবসের কর্মসূচি শুরু হয়। একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন। এরপর শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তারপর বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান শ্রদ্ধা জানান। পরে কূটনীতিক ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা জানানো শেষে শহীদ মিনার সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
‘গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রাকে সুসংহত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’
মহান শহীদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে শুক্রবার দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, মহান শহীদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আমাদের মাতৃভাষা বাংলাসহ বিশ্বের সব ভাষাভাষী মানুষ ও জাতিগোষ্ঠীকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। আজকের এই দিনে, আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সব শহীদকে, যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা প্রতিষ্ঠা করেছি মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা।
তারেক রহমান বলেন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, জনগণের অধিকার ও সমতা প্রতিষ্ঠাই ছিল একুশের মূল চেতনা। এ চেতনাকে ধারণ করে দীর্ঘ লড়াই সংগ্রাম পার হয়ে দেশে আজ গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গণতন্ত্রের এ অগ্রযাত্রাকে সুসংহত করতে বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ও যুবসমাজসহ সর্বস্তরের মানুষ সে সময়ের শাসকগোষ্ঠীর চোখ রাঙানি ও প্রশাসনের ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে আসে। মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে দুর্বার গতি পাকিস্তানি শাসকদের শঙ্কিত করে তোলে। সেদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, আবদুস সালাম, রফিক উদ্দিন আহমদ, শফিউর রহমানসহ আরো অনেকে প্রাণ হারান।
সেই রক্তের নদী পেরিয়ে ১৯৫৬ সালে বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পায় এবং ২১ ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে এই দিনে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেসকো একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ফলে ২০০০ সাল থেকেই বাংলাদেশের সঙ্গে দিবসটি বিশ্বজুড়ে যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপন করে আসছে। এভাবে আমাদের দিবসটি সারা বিশ্বে স্বীকৃতি পায়।