জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ হিসেবে পরিচিত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় দুই পুলিশ সদস্যের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে ৮০৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। রোববার (১৪ জুন) প্রকাশিত এ রায়ে মামলার অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদের সশ্রম ও বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশও বহাল রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণে আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ডকে জুলাই ও আগস্টের ঘটনাপ্রবাহে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের “প্রথম ধাপ” হিসেবে উল্লেখ করেছে।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি হলেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন এবং কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। এর আগে গত ৯ এপ্রিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করেছিলেন। এবার প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে শাস্তি নির্ধারণের যুক্তি, সাক্ষ্যপ্রমাণের মূল্যায়ন এবং আইনি বিশ্লেষণ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মঙ্গলবার (১৬ জুলাই) রংপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে পুলিশের গুলিতে নিহত হন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এরপর বিক্ষোভ আরও ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, একটি প্রাচীন চীনা প্রবাদ, “Every thousand miles has its first step”, এর আলোকে আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ডকে বৃহত্তর মানবতাবিরোধী অপরাধের সূচনা হিসেবে দেখা হয়েছে। রায়ে আরও বলা হয়, “শত্রুর জন্যও ইনসাফ” প্রতিষ্ঠার নীতিতে বিশ্বাস রেখেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের আইনি কাঠামো, ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায়, কমান্ড রেসপনসিবিলিটি, বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত সুসংগঠিত হামলা এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আইনি নজির নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করা হয়েছে। আদালত জানান, বিচারপ্রক্রিয়ায় ২৫ জন সাক্ষীর জবানবন্দি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজ এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত ৪১টি প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে পৃথকভাবে সাক্ষ্য ও প্রমাণ বিশ্লেষণ করে তাদের দায় নির্ধারণ করা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন সূত্র জানিয়েছে, গত ১১ জুন বিচারপতিদের স্বাক্ষরিত পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। এখন রায়ের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে কোনো সাজার বিরুদ্ধে আপিল করা হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এদিকে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম জানিয়েছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট আরও তিনটি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা বর্তমানে রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে জাসদ সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ এবং রামপুরা হত্যাকাণ্ডের মামলার রায় চলতি মাসেই আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যা ও লাশ পোড়ানোর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় দণ্ডিত আসামিদের পক্ষ থেকে আপিল করা হয়েছে। আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবুল হাসান দাবি করেছেন, উপস্থাপিত সাক্ষ্যপ্রমাণে আসামিদের সম্পৃক্ততা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়নি এবং তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসারেই দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তবে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওই মামলার রায় নিয়ে একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি কিছু অভিযোগ তদন্ত করছে।
আবু সাঈদ হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট বিচারপ্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সামনে এলো। একই সঙ্গে বিচারাধীন অন্যান্য মামলার রায় নিয়েও নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
সূত্র: এফএনএস।