দেশে নানামুখী সঙ্কটে পোলট্রি খাত। ফলে কমছে পোলট্রি উৎপাদন আর বাড়ছে মুরগি ও ডিমের দাম। বর্তমানে গভীর বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রাণিজ প্রোটিননির্ভর শিল্পটি। দেশের জ্বালানি তেলের পরিস্থিতি, দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং, আমদানিনির্ভর কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, খামার পর্যায়ে রোগবালাই, পরিবহন ব্যয় বাড়া এবং কর-শুল্কের বাড়তি চাপ এমন বিপর্যয়কর পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে।
পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনা গেলে ঝুঁকিতে পড়বে দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা। ইতিমধ্যে ক্রমাগত দাম বেড়ে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে ডিম ও মুরগির দাম। পোলট্রি খামারি ও ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (বিএবি) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিদ্যুৎ পোলট্রি শিল্পের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্রয়লারের বাচ্চা উৎপাদন, ডিম ইনকিউবেশন, খামারের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিদিন লোডশেডিং হচ্ছে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত। তাছাড়া বাচ্চা উৎপাদনের এই সংকটের সঙ্গে খাদ্য ও কাঁচামালের দাম যুক্ত হয়েছে। পোলট্রি খাতে মোট উৎপাদন খরচের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ খাদ্যেব্যয় হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে ভুট্টা, সয়াবিন মিলসহ বিভিন্ন কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে ফিড উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। আর বিদ্যমানবাজার ব্যবস্থাপনায় খামারি পর্যায়ে ডিম-মুরগি কম দামে বিক্রি হলেও খুচরায় অনেক বেশি দাম।
সূত্র জানায়, দেশের বিদ্যমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে বয়লার বাচ্চা উৎপাদনে বড় ধাক্কা লেগেছে। দেশে প্রতি সপ্তাহে চাহিদা রয়েছে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্রয়লার বাচ্চার। কিন্তু ইনকিউবেটরে নিরবচ্ছিন্ন তাপমাত্রা বজায় রাখতে না পারায় উৎপাদন কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। প্রতি সপ্তাহে কম উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় ৫০ লাখ বাচ্চা। তাতে সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি সৃষ্টি করছে। আর সরাসরি তা বাজারে প্রভাব ফেলবে। তাছাড়া জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর ও শুল্কের বাড়তি চাপ। চলতি বাজেটে করপোরেট কর ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৭.৫ শতাংশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন কর ও শুল্ক বাড়ানোয় পোলট্রির খাদ্য ও অন্যান্য উপকরণের দাম দফায় দফায় বেড়েছে। আর জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খাতে সরাসরি প্রভাব পড়েছে। ইতিমধ্যেই পরিবহন খরচ প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে।
সূত্র আরো জানায়, এদেশে পোলট্রি শিল্পের উৎপাদন ব্যয় ছয় বছরে দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২২ সালে উৎপাদন খরচ বেড়েছিল ১১৫ শতাংশ, ২০২৩ সালে ১৪৫ শতাংশ, ২০২৪ সালে ১৭০ শতাংশ, ২০২৫ সালে প্রায় ১৯০ শতাংশ ও ২০২৬ সালে এসে তা দাঁড়িয়েছে ২০০ শতাংশে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের চেয়ে বাংলাদেশে পোলট্রি ও পশুখাদ্য খাতে কর সুবিধা কম। অনেক দেশেই পোলট্রি খাতে বিভিন্ন ধরনের কর অব্যাহতি এবং প্রণোদনা দেয়া হলেও বাংলাদেশে বহাল রয়েছে উচ্চ কর কাঠামো। বর্তমানে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে আবারো বেড়েছে ডিমের দাম। এখন প্রতি ডজন লাল ডিম ১২০ থেকে ১৩০ টাকা এবং সাদা ডিম ১১০ থেকে ১১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক মাস আগেও ডজনপ্রতি দাম ছিল ৯৫ থেকে ১০০ টাকা ছিলো। এক মাসে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
এদিকে কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের পোলট্রি শিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে খাদ্যের দাম কমানো ছাড়া বিকল্প নেই। কারণ খাদ্যের পেছনে যায় খামার পরিচালনার মোট ব্যয়ের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ। খাদ্যের কাঁচামাল আমদানিনির্ভর হওয়ায় এ খাতে আয়কর ও শুল্ক কমানো ছাড়া বিকল্প নেই। পাশাপাশি দেশীয় খাদ্য উৎপাদনে উদ্যোক্তা তৈরি এবং যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কছাড় দেয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী জানান, বিশ্বের কোথাও খাদ্য উৎপাদন সংশ্লিষ্ট খাতে এতো উচ্চ কর নেই। আর কৃষিপ্রধান দেশ হয়েও বাংলাদেশে উল্টো প্রবণতা বিরাজ করছে। তার প্রভাব ইতোমধ্যে উৎপাদনকারীদের ওপর পড়েছে এবং ভবিষ্যতে বাজার ও ভোক্তাদের ওপরও পড়বে। বর্তমান কর ও শুল্ক অর্ধেকে নামানো না হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা টিকতে পারবে না। এতে পুরো খাত বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।