ব্যাংকিং খাত থেকে স্বল্প সময়েই বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়েছে সরকার। মাত্র ৪৩ দিনে প্রায় ৪০ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার ফলে দেশের অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংক-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ৬৮ হাজার ২৩০ কোটি টাকা। তবে ৩১ মার্চ শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকায়। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে বড় অঙ্কের নতুন ঋণ যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৭৮ হাজার ৪৯ কোটি টাকা এসেছে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে এবং ৩০ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের এই ঋণগ্রহণ বেসরকারি খাতে অর্থপ্রবাহে চাপ তৈরি করতে পারে। যদিও বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্যের দুর্বল অবস্থার কারণে তাৎক্ষণিক প্রভাব সীমিত থাকতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের নয় মাসেই ব্যাংক ঋণের পরিমাণ বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, সেখানে মার্চ শেষে তা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৫১ কোটি টাকায়। পরে বিশেষ নিলামের মাধ্যমে আরও ১০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে।
অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬.০৩ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্নের কাছাকাছি। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদহার, খেলাপি ঋণের চাপ এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে এই খাতে গতি আসছে না।
ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় চাপ না পড়লেও ধারাবাহিকভাবে ঋণ বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে তা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এদিকে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি-এর সভাপতি তাসকীন আহমেদ জানান, ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট রয়েছে এবং মূলধন ঘাটতির কারণে অনেক ব্যাংক নতুন বিনিয়োগে যেতে পারছে না। ফলে ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনীয় ঋণ পাচ্ছেন না।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাও দেশের অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে জুন পর্যন্ত সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসেই রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-এর ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ঋণ নেওয়া কিছুটা অনিবার্য হলেও ঋণ ফাঁদ এড়াতে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো জরুরি।
অন্যদিকে দেশের বৈদেশিক ঋণও দ্রুত বেড়েছে। ২০০৭ সালে ২০.৬৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে তা দাঁড়িয়েছে ১১৩.৫১ বিলিয়ন ডলারে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৩ লাখ ৯৬ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা। মাথাপিছু বিদেশি ঋণ এখন প্রায় ৭৯ হাজার ৪৬৩ টাকা।
বর্তমানে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ সাড়ে ১১ লাখ কোটি টাকার বেশি, সঞ্চয়পত্রে ৩ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা এবং দেশীয় উৎস থেকে নেওয়া ঋণ প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকা। এই বিপুল ঋণের বিপরীতে সুদ পরিশোধেই সরকারের ব্যয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে।