এবারের পবিত্র হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা হবে আজ মঙ্গলবার। ৯ জিলহজের এই দিনে সৌদি আরবের ঐতিহাসিক আরাফাত ময়দানে অবস্থান করবেন সারা বিশ্বের হজযাত্রীরা। লাখো কণ্ঠে ধ্বনিত হবে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হাম্দা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুল্ক, লা শারিকা লাক।’অর্থাৎ আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই, সব প্রশংসা ও নিয়ামত শুধু তোমারই, সব সাম্রাজ্যও তোমার, তোমার কোনো শরিক নেই।
আজকের দিনকে ইসলামে ‘ইয়াওমে আরাফাহ’বা আরাফাত দিবস হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। হজের ফরজ কাজ হিসেবে আজ সূর্যোদয়ের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাত ময়দানে অবস্থান করবেন হজযাত্রীরা।
এদিন দুপুরে মসজিদে ‘নামিরা’ থেকে প্রচারিত হবে হজের খুতবা। হজযাত্রীরা এই খুতবা শুনবেন পরে জোহর ও আছরের নামাজ একসঙ্গে আদায় করবেন। এবার পবিত্র হজের খুতবা দেবেন মসজিদে নববীর প্রবীণ ইমাম ও খতিব শায়খ আলী বিন আবদুর রহমান আল-হুজাইফি। এই খুতবা বাংলাসহ বিশ্বের ৫০টি ভাষায় অনুবাদ ও সম্প্রচার করা হবে।
ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে হজ একটি। আর্থিক ও শারীরিকভাবে সামর্থ্যবান সব মুসলমান পুরুষ ও নারীর ওপর জীবনে একবার হজ ফরজ। জিলহজ মাসের নির্দিষ্ট দিনে (মূলত ৯ জিলহজ) হজের নিয়তসহ ইহরাম পরিধান করে আরাফাত ময়দানে অবস্থান করা এবং পবিত্র কাবা শরিফ তাওয়াফ করাকেই হজ বলা হয়। তবে ৮ জিলহজ থেকে ১২ জিলহজ পর্যন্ত হজের আরো কিছু ওয়াজিব ও সুন্নত কার্যক্রম পালন করতে হয়।
এর আগে গতকাল সোমবার মিনায় তাঁবুতে হজযাত্রীদের অবস্থানের মধ্য দিয়ে হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। রোববার সন্ধ্যার পর থেকেই হজের নিয়তে সেলাইবিহীন কাপড় দিয়ে এহরাম বেঁধে তালবিয়া পাঠ করতে করতে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে মিনার উদ্দেশ্যে রওনা শুরু করেন হজযাত্রীরা। সৌদি কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত বাসযোগে সেখানে হজযাত্রীদের নেওয়া হয়।
ইসলামের বিধান অনুযায়ী সোমবার জোহরের আগেই সবাই মিনায় তাঁবুতে পৌঁছান। লাখ লাখ হজযাত্রীর পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে তাঁবুর শহর মিনা।
হজের বিধান অনুযায়ী মিনায় অবস্থান করা হজের সুন্নত। সেখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের পাশাপাশি নফল ইবাদত-বন্দেগি করেন সবাই। আজ মঙ্গলবার ফজরের পর আরাফাত ময়দানের উদ্দেশে রওনা দেন হজযাত্রীরা। অনেকে গতকাল রাতেই আরাফা এলাকায় পৌঁছান।
আরাফাত ময়দানে হজযাত্রীদের অবস্থানকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমাবেশ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এই ময়দানেই ঐতিহাসিক জাবালে রহমত বা রহমতের পাহাড় অবস্থিত। বিবি হাওয়া এবং হজরত আদম (আ.)-এর পৃথিবীতে আগমনের পরে এখানেই মিলিত হয়েছিলেন বলে ঐতিহাসিকদের অভিমত। বিশ্বনবী (সা.) এই পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়েই বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন।
আজ সূর্যাস্তের পর আরাফাত ময়দান থেকে মুজদালিফার উদ্দেশে রওয়ানা দেবেন হাজিরা। সেখানে মাগরিব ও এশার নামাজ শেষে উন্মুক্ত আকাশের নিচে রাত্রিযাপন করবেন। আগামীকাল ১০ জিলহজ সূর্যোদয়ের আগে মুজদালিফা থেকে মিনায় যাবেন হাজিরা এবং শুধু বড় ‘জামারায়’ সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করবেন। এরপর মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় পশু কোরবানি দেবেন এবং মাথা মুণ্ডন কিংবা চুল ছোট করবেন। পরে ইহরামের কাপড় বদলিয়ে সাধারণ পোশাক পরে ফেলবেন। একই দিন ‘তাওয়াফে ইফাদা’ করবেন হাজিরা। এদিন না পারলে এটি ১১ বা ১২ তারিখেও করতে পারবেন এবং একই সঙ্গে সাঈও করবেন।
এদিন সৌদি আরবে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে। পর্যায়ক্রমে ১১ ও ১২ জিলহজ ‘জামারায়’ পাথর নিক্ষেপসহ হজের বাকি আনুষ্ঠানিকতা শেষে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগে মিনা ত্যাগ করবেন হাজিরা।
পবিত্র হজের তিনটি ফরজের প্রথম কাজটি হলোÑএহরাম বাঁধা। বাকি দুটি হলোÑআরাফাতের ময়দানে অবস্থান ও তাওয়াফে জিয়ারাহ।
হজে সাড়ে ৭৮ হাজার বাংলাদেশি
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এ বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ১৬ থেকে ১৮ লাখ মুসলমান হজ পালন করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। চলতি বছরে বাংলাদেশ থেকে সাড়ে ৭৮ হাজার মানুষ হজ পালন করছেন। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে চার হাজার সরকারি ব্যবস্থাপনায় এবং বাকিরা বেসরকারি হজ এজেন্সির মাধ্যমে হজে গেছেন।
হজ পালনের আগে এ পর্যন্ত ২৮ জন বাংলাদেশি হজযাত্রী মারা গেছেন। এর মধ্যে পুরুষ ১৯ জন ও মহিলা ৯ জন।
এদিকে, বাংলাদেশি হজ যাত্রীদের সার্বিক সেবার জন্য ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একাধিক টিম, বাংলাদেশ হজ অফিস ও হজ আইটি দল নানা কার্যক্রম চালাচ্ছেন। ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদের নেতৃত্বে চার সদস্যের উচ্চপর্যায়ের হজ মনিটরিং টিম সৌদিতে অবস্থান করছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ সত্ত্বেও বেড়েছে হাজি
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ এবং চরম ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও চলতি বছরের পবিত্র হজে অংশ নিতে এ পর্যন্ত ১৫ লাখেরও বেশি বিদেশি হজযাত্রী সৌদি আরবে পৌঁছেছেন। সৌদি কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বৈরী পরিস্থিতি সত্ত্বেও এই সংখ্যা গত বছরের আন্তর্জাতিক হজ যাত্রীর সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে।
সৌদি আরবের হজ পাসপোর্ট ফোর্সের কমান্ডার সালেহ আল-মুরাব্বা গত শুক্রবার রাতে সংবাদ সম্মেলনে জানান, বিদেশ থেকে আগত হাজিদের মোট সংখ্যা এখন পর্যন্ত ১৫ লাখ ১৮ হাজার ১৫৩ জনে পৌঁছেছে। গত বছর মোট ১৬ লাখ ৭৩ হাজার ৩২০ জন হজ পালন করেছিলেন। যার মধ্যে সৌদি আরবের বাইরে থেকে এসেছিলেন ১৫ লাখ ৬ হাজার ৫৭৬ জন।
তীব্র তাপদাহে সতর্কতা
সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হজ যাত্রীদের রোদছাতার সর্বোত্তম ব্যবহার সংক্রান্ত নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। পবিত্র স্থানগুলোতে চলাচলের সময় সরাসরি সূর্যের সংস্পর্শ থেকে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে মন্ত্রণালয়টি জোর দিয়েছে।
মন্ত্রণালয় বলেছে, ছাতা ব্যবহার করলে তাপজনিত অবসাদ, সানস্ট্রোক এবং পানিশূন্যতার ঝুঁকি কমে। এটি অতিবেগুনি রশ্মি থেকেও সুরক্ষা দেয় এবং চারপাশের তাপমাত্রা প্রায় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমাতে পারে।
হজ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে প্রস্তুতির স্তর বৃদ্ধি এবং সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে সৌদির হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে হাজিদের নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের সরাসরি সূর্যের আলো এবং তীব্র গরমের সময় হাঁটাচলা থেকে বিরত থাকা এবং যথাসম্ভব তাঁবুর ভেতরে অবস্থানের পরামর্শ দেওয়ার জন্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে রোদে ছাতা ব্যবহার, প্রচুর পরিমাণে পানি ও তরল খাবার গ্রহণের অনুরোধ করা হয়েছে। এছাড়া, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জারি করা সব স্বাস্থ্য বার্তা ও পরিচালন নির্দেশনা মেনে চলার বিষয়ে হজযাত্রীদের উদ্বুদ্ধকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।
বাংলাদেশি হজযাত্রীদের তীব্র গরমে সতর্কতা অবলম্বন ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অনুরোধ জানিয়েছে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
এদিকে গরম আবহাওয়ার কারণে মিনা ও আরাফাত এলাকায় পানির সূক্ষ্ম কুয়াশা ছড়ানোর ব্যবস্থা করেছে সৌদি সরকার। হজযাত্রীদের জন্য ঠান্ডা পানির বোতল বিতরণ করছেন স্বেচ্ছাসেবকরা। মিনার তাঁবুগুলোতে শীতাতপের ব্যবস্থা রয়েছে।